গণমানুষের সাথে
পোর্টাল: www.gonabarta.com | প্রিন্টের সময়: ০৪ নভেম্বর, ২০২৬, ০৮:৫২ পিএম
রাতের শেষ প্রহরে পুরোনো ঘড়িটা হঠাৎ বেজে উঠল
ফিরে আসার একটি সকাল
লেখক: এম আব্দুল্লাহ আল আমিন
রাতের শেষ প্রহরে পুরোনো ঘড়িটা হঠাৎ বেজে উঠল।
মাহফুজ চমকে ঘুম থেকে উঠে বসল। ঘড়িটা তার বাবার। বহু বছর ধরে বন্ধ পড়ে ছিল। গত সপ্তাহে আলমারি গোছাতে গিয়ে পুরোনো জিনিসপত্রের ভেতর সেটি খুঁজে পেয়েছিল সে। কৌতূহলবশত ঘড়িটি মেরামত করিয়ে এনেছে। কিন্তু এত রাতে সেটি বেজে উঠবে, তা ভাবেনি।
ঘড়ির কাঁটা তখন ভোরের দিকে এগোচ্ছে।
হঠাৎ তার মনে পড়ল, এই শব্দের সঙ্গে একসময় তার জীবনের কত গভীর সম্পর্ক ছিল!
শীতের ভোরে বাবা এই ঘড়ির অ্যালার্ম দিয়ে রাখতেন। অ্যালার্ম বাজলেই ছেলের ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে ডাকতেন,
— মাহফুজ, ওঠো বাবা। ফজরের সময় হয়েছে।
লেপের ভেতর থেকে বিরক্ত কণ্ঠে উত্তর আসত,
— আব্বা, আর পাঁচ মিনিট!
বাবা হাসতেন। তারপর বলতেন,
— পাঁচ মিনিট ঘুমালে হয়তো শরীরের আরাম হবে, কিন্তু আল্লাহর ডাকে সাড়া দেওয়ার যে সুযোগ, সেটা আর ফিরে নাও পেতে পারো।
সেদিন কথাটার গভীরতা বোঝার বয়স মাহফুজের ছিল না। আজ বয়স হয়েছে, নিজের সংসার হয়েছে, অর্থ-সম্পদ হয়েছে। শুধু সেই মানুষটি নেই, যিনি প্রতিদিন ভোরে তাকে ঘুম থেকে ডেকে তুলতেন।
বাবার মৃত্যুর পর জীবনটা কেমন যেন দ্রুত বদলে গিয়েছিল। পড়াশোনা শেষ করে চাকরি, তারপর ব্যবসা। একসময় নিজের প্রতিষ্ঠান দাঁড় করিয়েছে। ব্যস্ততা বেড়েছে, পরিচিত মানুষের সংখ্যা বেড়েছে, ব্যাংক হিসাবের অঙ্কও বড় হয়েছে।
শুধু ছোট হয়ে এসেছে নিজের জন্য রাখা সময়টুকু।
নামাজের ব্যাপারেও সে নিজেকে নানা অজুহাত দেখিয়েছে। কখনো কাজের চাপ, কখনো ক্লান্তি, কখনো কোনো জরুরি মিটিং। প্রথম দিকে নামাজ ছুটে গেলে মন খারাপ হতো। পরে সেই মন খারাপও একসময় অভ্যাসের কাছে হার মেনেছে।
মানুষ যে সবকিছু হারায়, তা সব সময় বুঝতে পারে না। কিছু হারানোর শব্দ হয় না, কান্না হয় না, এমনকি কোনো শোকসভাও বসে না। শুধু একদিন নির্জনে বসে মনে হয়, নিজের ভেতর থেকে কী যেন হারিয়ে গেছে।
মাহফুজের জীবনেও সেই হারিয়ে যাওয়ার নাম ছিল প্রশান্তি।
ঘড়ির শব্দ থেমে গেল। বাইরে তখন ফজরের আজান শুরু হয়েছে।
মাহফুজ বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। জানালার পর্দা সরিয়ে দেখল, আকাশের গায়ে রাতের শেষ অন্ধকারটুকু লেগে আছে। দূরের মসজিদ থেকে ভেসে আসা আজানের প্রতিটি ধ্বনি যেন তার বহুদিনের অবহেলার দরজায় কড়া নাড়ছে।
সে ধীরে ধীরে ওজু করতে গেল।
আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের মুখের দিকে তাকিয়ে তার মনে হলো, এই মানুষটিকে সে কতদিন ধরে শুধু বাইরের দিক থেকে সাজিয়েছে! দামি পোশাক, সুগন্ধি, সুন্দর বাড়ি—কোনো কিছুরই কমতি রাখেনি। অথচ ভেতরের মানুষটির খবর নেওয়ার সময় হয়নি।
ওজু শেষে আলমারি থেকে বাবার পুরোনো জায়নামাজটি বের করল। ভাঁজ খুলতেই কাপড়ের ভেতর থেকে এক টুকরো হলদেটে কাগজ মেঝেতে পড়ে গেল।
কাগজটিতে বাবার হাতের লেখা—
‘মাহফুজের ফজরের অ্যালার্ম। ওকে ডাকতে ভুলবে না।’
মাহফুজ কাগজটি হাতে নিয়ে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
কত সাধারণ একটি বাক্য! অথচ তার ভেতরে কত মমতা, কত দায়িত্ববোধ, কত নীরব ভালোবাসা জমে আছে!
চোখের সামনে বাবার মুখটি ভেসে উঠল। মনে পড়ল, একদিন মসজিদ থেকে ফিরে বাবা তার মাথায় হাত রেখে বলেছিলেন,
— বাবা, মানুষ বড় হলে শুধু উপার্জন করতে শেখে না, নিজের আত্মারও যত্ন নিতে শেখে। মনে রেখো, দুনিয়ার দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে রবের সঙ্গে সম্পর্কটা যেন হারিয়ে না ফেলো।
মাহফুজ সেদিনও কথাটি শুনেছিল। কিন্তু শোনার আর হৃদয়ে ধারণ করার মধ্যে যে কতখানি দূরত্ব, তা বুঝতে তার বহু বছর লেগে গেল।
সে জায়নামাজ বিছিয়ে দাঁড়াল।
তাকবির বাঁধার সময় বুকের ভেতর কেমন একটা কাঁপুনি অনুভব করল। দীর্ঘদিনের অনভ্যাসে কোরআন তিলাওয়াতেও কোথাও কোথাও আটকে গেল। কিন্তু আজ সে তাড়াহুড়ো করল না। ধীরে ধীরে নামাজ শেষ করল।
সিজদায় গিয়ে চোখের পানি আর ধরে রাখতে পারল না।
তার ঠোঁট কাঁপছিল।
— হে আল্লাহ, আমি নিজের অবহেলায় অনেক দূরে চলে গেছি। কতবার তোমার ডাক শুনেছি, অথচ সাড়া দিইনি। আজ ফিরে আসতে চাই। আমাকে তোমার রহমত থেকে বঞ্চিত করো না।
সেদিন তার কান্নার কোনো সাক্ষী ছিল না। বন্ধ দরজার ওপারে কেউ জানতেও পারল না, একজন মানুষ কত বছরের জমে থাকা অনুশোচনা নিয়ে তার রবের সামনে মাথা নত করে আছে।
নামাজ শেষে অনেকক্ষণ বসে রইল মাহফুজ। জানালার বাইরে ধীরে ধীরে সকাল ফুটছে।
তার মনে হলো, ফিরে আসার জন্য মানুষের সব সময় নতুন কোনো পরিচয়ের প্রয়োজন হয় না। কখনো কখনো নিজের পুরোনো পরিচয়টুকু ফিরে পাওয়াই সবচেয়ে বড় অর্জন।
সকালে নাশতার টেবিলে সাত বছরের ছেলে আরহাম এসে পাশে বসল।
— আব্বু, তুমি আজ এত সকালে উঠেছ কেন?
— ফজরের নামাজ পড়েছি, বাবা।
ছেলেটি কিছুক্ষণ বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকল। তারপর বলল,
— তুমি কি কালও উঠবে?
মাহফুজ মৃদু হাসল।
— চেষ্টা করব, ইনশাআল্লাহ।
— তাহলে আমাকেও ডাকবে? আমি তোমার সঙ্গে মসজিদে যাব।
ছেলের কথায় মাহফুজের বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল। মনে হলো, সময় যেন এক অদ্ভুত বৃত্ত এঁকে দিয়েছে। একদিন তার বাবা তাকে ঘুম থেকে ডাকতেন, আজ তার নিজের ছেলে তার কাছে সেই একই আবদার করছে।
সে ছেলের মাথায় হাত রেখে বলল,
— অবশ্যই ডাকব, বাবা।
কথাটা বলতে গিয়ে তার মনে হলো, শুধু ছেলেকে ডাকলেই হবে না, নিজেকেও প্রতিদিন জাগিয়ে রাখতে হবে।
তবে জীবন তো আর একটি সুন্দর সকালের নাম নয়। সকাল পেরিয়ে দুপুর আসে, দুপুর পেরিয়ে বিকেল। মানুষের পরীক্ষা শুরু হয় সেই ব্যস্ততার ভেতরেই, যেখানে ভালো সিদ্ধান্তগুলোকে ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।
সেদিন অফিসে গিয়ে মাহফুজ আবারও পুরোনো ব্যস্ততার মুখোমুখি হলো। একের পর এক ফোন, জরুরি কাগজপত্র, কর্মচারীদের নানা সমস্যা। কাজের চাপে সে একসময় নিজের প্রতিজ্ঞার কথাও প্রায় ভুলে গেল।
কিন্তু এবার একটি পরিবর্তন হয়েছিল। নামাজের সময় হলে সে কাজ থামিয়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করল। সবকিছু একদিনে নিখুঁত হয়ে গেল না, তবে নিজের অবহেলাকে আর স্বাভাবিক বলে মেনে নিল না।
সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে বাবার পুরোনো ঘড়িটি টেবিলের ওপর রাখল। ঘড়ির কাঁটা সচল। পাশে সেই হলদেটে কাগজটি।
কাগজটির নিচে নিজের হাতে আরও একটি লাইন লিখল—
‘এবার আমাকে শুধু ডাকতে হবে না, নিজেকেও জাগতে হবে।’
রাতে ঘুমানোর আগে আরহামের ঘরে গেল। ছেলেটি ঘুমিয়ে পড়েছে। বালিশের পাশে ছোট্ট সাদা টুপিটি রাখা। মাহফুজ টুপিটি হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকল।
তার মনে হলো, বাবার কাছ থেকে পাওয়া সবচেয়ে মূল্যবান উত্তরাধিকার কোনো সম্পদ নয়; বরং এমন কিছু শিক্ষা, যা পরবর্তী প্রজন্মের হৃদয়ে বেঁচে থাকে।
বাইরে তখন রাত গভীর হচ্ছে।
টেবিলের ওপর পুরোনো ঘড়িটি নীরবে সময় গুনছে।
আর মাহফুজ ভাবছে, জীবনের কতগুলো সকাল সে অকারণে ঘুমিয়ে কাটিয়েছে! কতগুলো আজান শুনেও নিজের ব্যস্ততাকে অগ্রাধিকার দিয়েছে! অথচ প্রতিটি নতুন সকালই ছিল ফিরে আসার একটি সুযোগ।
পরদিন ভোরে ঘড়ির অ্যালার্ম বাজার আগেই তার ঘুম ভেঙে গেল।
সে ছেলের ঘরের দরজায় গিয়ে দাঁড়াল।
আলতো করে ডাকল,
— আরহাম, ওঠো বাবা। ফজরের সময় হয়েছে।
ঘুমজড়ানো চোখে ছেলেটি তাকাল। তারপর বাবার হাতটি ধরে বলল,
— চলো আব্বু।
দুজন পাশাপাশি ঘর থেকে বেরিয়ে এল।
দরজার বাইরে তখন নতুন দিনের আলো ফুটছে। দূরের মসজিদ থেকে ভেসে আসছে ফজরের নামাজের ডাক।
মাহফুজ একবার আকাশের দিকে তাকাল। মনে হলো, জীবনের সব হারানো সময় ফিরে পাওয়া যায় না, কিন্তু অবশিষ্ট সময়টুকু সুন্দর করে গড়ে তোলার সুযোগ এখনো আছে।
সে ছেলের হাতটি একটু শক্ত করে ধরল।
তারপর হাঁটতে শুরু করল মসজিদের পথে।
কোনো বিজয়ীর মতো নয়, কোনো সাধকের মতোও নয়; বরং একজন সাধারণ মানুষ হিসেবে—যে নিজের ভুল বুঝতে পেরেছে এবং নতুন করে পথ চলার সাহস সঞ্চয় করেছে।
সেদিন ভোরে মাহফুজের মনে হয়েছিল, মানুষের জীবনে কিছু সকাল শুধু সূর্যোদয়ের জন্য আসে না; আসে ঘুমিয়ে থাকা বিবেককে জাগিয়ে দেওয়ার জন্যও।
আর কখনো কখনো একটি ফজরের আজানই হয়ে ওঠে ফিরে আসার প্রথম সিঁড়ি।