গণমানুষের সাথে
পোর্টাল: www.gonabarta.com | প্রিন্টের সময়: ৩১ অক্টোবর, ২০২৬, ০৯:৫৪ পিএম
"প্রযুক্তি বাড়ুক, বিবেক হারিয়ে না যাক।
"সন্তানকে শুধু শিক্ষিত নয়, বিবেকবান মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে চাই।"
বর্তমানে ইন্টারনেটের বদৌলতে ভালো-মন্দ সবকিছুই মুহূর্তে মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে যাচ্ছে। প্রযুক্তির কল্যাণে আমরা পবিত্র কোরআনের শুদ্ধ উচ্চারণ শিখছি, জের-জবর-পেশ ও নোকতাসহ তিলাওয়াতের ভুল সংশোধন করছি। কিন্তু একই সঙ্গে আমাদের সমাজে বাড়ছে মিথ্যাচার, গিবত, পরনিন্দা, প্রতারণা, অসহিষ্ণুতা ও অন্যের অধিকার নষ্ট করার প্রবণতা। প্রশ্ন হলো, জ্ঞানের এই বিস্তারের সঙ্গে আমাদের নৈতিকতা ও মানবিকতার বিকাশ কতটা ঘটছে?
একটি ছোট্ট ঘটনা ভাবুন। মা বাসায় আছেন, অথচ ফোনে বলছেন, ‘বাসায় নেই।’ সন্তানকে শিখিয়ে দিচ্ছেন, ‘বল, আম্মু মৌচাকের জ্যামে আটকে আছে।’ শিশুটি মায়ের কাছ থেকেই শিখছে—নিজের সুবিধার জন্য মিথ্যা বলা যায়। অথচ এই আমরাই সন্তানকে সত্যবাদী হওয়ার উপদেশ দিই!
শিশুকে মিথ্যা বলার কৌশল শিখিয়ে সত্যবাদী হওয়ার প্রত্যাশা করা—এ কেমন শিক্ষা?
এভাবেই আমাদের অজান্তে কিংবা নিজেদের সুবিধার জন্য করা ছোট ছোট অন্যায় শিশুর মনে বড় হয়ে ওঠে। পরে যখন সমাজে অসততা, প্রতারণা ও মূল্যবোধের অভাব দেখি, তখন শুধু নতুন প্রজন্মকে দোষ দিয়ে দায়িত্ব শেষ করা যায় না। কারণ শিশুর প্রথম বিদ্যালয় পরিবার, আর প্রথম শিক্ষক তার মা-বাবা।
আমার বিশ্বাস, শুধু উপদেশ দিয়ে এই পরিস্থিতি বদলানো সম্ভব নয়। প্রয়োজন পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম ও রাষ্ট্রের সমন্বিত, বাস্তবসম্মত ও জবাবদিহিমূলক উদ্যোগ।
প্রস্তাব: কে কী দায়িত্ব পালন করবে?
প্রতিষ্ঠান| বাস্তব করণীয়| দায়িত্বপ্রাপ্ত পক্ষ
পরিবার| সপ্তাহে এক দিন ১৫ মিনিটের পারিবারিক নৈতিক আলোচনা; মা-বাবার নিজেদের আচরণে সত্যবাদিতার দৃষ্টান্ত স্থাপন| মা-বাবা ও অভিভাবক
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান| প্রতি মাসে একটি নৈতিকতা ও মানবিকতাবিষয়ক কার্যক্রম; শিক্ষার্থীদের বাস্তব জীবনে সততা ও সহমর্মিতার চর্চা| শিক্ষা মন্ত্রণালয়, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়, এনসিটিবি ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান
ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান| খুতবা, ধর্মীয় আলোচনা ও শিক্ষামূলক অনুষ্ঠানে গিবত, মিথ্যা, আমানত ও মানুষের অধিকার নিয়ে ধারাবাহিক সচেতনতা| ইসলামিক ফাউন্ডেশন, আলেম-ওলামা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান
গণমাধ্যম| সপ্তাহে অন্তত একটি সচেতনতামূলক অনুষ্ঠান, নাটিকা বা ভিডিও প্রচার| বাংলাদেশ টেলিভিশন, বাংলাদেশ বেতার ও বেসরকারি গণমাধ্যম
রাষ্ট্র ও স্থানীয় প্রশাসন| বিদ্যমান প্রতিষ্ঠান ব্যবহার করে পরীক্ষামূলক নৈতিকতা চর্চা কর্মসূচি; ছয় মাস অন্তর অগ্রগতি মূল্যায়ন| সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, জেলা ও উপজেলা প্রশাসন
সামাজিক সংগঠন| শিশু-কিশোরদের কর্মশালা, স্বেচ্ছাসেবা ও মানবিক কার্যক্রম পরিচালনা| স্থানীয় ক্লাব, পাঠাগার, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ও অভিভাবক সমিতি
বাস্তবায়নের তিনটি ধাপ
প্রথম ধাপ—প্রথম তিন মাস: সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি নির্ধারণ করবে, বিদ্যমান কার্যক্রম পর্যালোচনা করবে এবং কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও এলাকায় পরীক্ষামূলক কর্মসূচি শুরু করবে।
দ্বিতীয় ধাপ—পরবর্তী তিন মাস: শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও শিক্ষকদের মতামত নিয়ে কার্যক্রমের অগ্রগতি যাচাই করা হবে। কোথায় সমস্যা হচ্ছে, কী পরিবর্তন এসেছে এবং কী উন্নতি প্রয়োজন—তা নির্ধারণ করা হবে।
তৃতীয় ধাপ—ছয় মাস পর: মূল্যায়নের ফলাফল প্রকাশ করে সফল উদ্যোগগুলো পর্যায়ক্রমে আরও এলাকায় সম্প্রসারণ করা হবে। প্রয়োজনীয় বাজেট, দায়িত্ব ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
এখানে লক্ষ্য কাউকে শাস্তি দেওয়া বা ব্যক্তিগত বিশ্বাস চাপিয়ে দেওয়া নয়; লক্ষ্য হলো মানুষের বিবেক জাগ্রত করা, সৎ আচরণে উৎসাহিত করা এবং ভুল সংশোধনের সুযোগ তৈরি করা।
আমরা সন্তানদের জন্য ভালো স্কুল খুঁজি, ভালো ফলাফলের প্রত্যাশা করি, সুন্দর ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখি। কিন্তু তাদের সত্যবাদী, দায়িত্বশীল ও মানবিক মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে কতটা সময় দিই?
একজন শিশু যখন দেখে তার বাবা নিজের ভুল স্বীকার করছেন, মা অন্যের অনুপস্থিতিতে তার সম্মান রক্ষা করছেন, শিক্ষক ন্যায়বিচার করছেন এবং সমাজের মানুষ বিপদে পড়া প্রতিবেশীর পাশে দাঁড়াচ্ছেন—তখন সে বইয়ের পাতার বাইরে জীবন্ত নৈতিকতা শিখতে পারে।
আমরা শুধু এমন প্রজন্ম চাই না, যারা পরীক্ষায় ভালো নম্বর পাবে; আমরা এমন প্রজন্ম চাই, যারা অন্যের হক নষ্ট করতে লজ্জা পাবে, মিথ্যা বলে সুবিধা নেওয়ার পরিবর্তে সত্য বলার সাহস দেখাবে, অন্যের কষ্ট বুঝবে এবং নিজের ভুল সংশোধন করতে শিখবে।
আমাদের সন্তানদের জন্য শুধু সম্পদ রেখে গেলে হবে না; তাদের জন্য একটি সৎ, নিরাপদ ও মানবিক সমাজও রেখে যেতে হবে।
তাই সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে আমার আন্তরিক আহ্বান—নৈতিকতা ও মূল্যবোধের শিক্ষা যেন কেবল বক্তৃতা, সভা কিংবা কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ না থাকে। প্রতিটি প্রতিষ্ঠান তার নির্দিষ্ট দায়িত্ব পালন করুক, কাজের অগ্রগতি যাচাই হোক এবং ভালো উদ্যোগগুলো ধারাবাহিকভাবে এগিয়ে নেওয়া হোক।
পরিবর্তন শুরু হোক আমাদের ঘর থেকে, বিস্তৃত হোক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, শক্তি পাক সামাজিক ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতায়, আর রাষ্ট্রের পরিকল্পিত উদ্যোগে পৌঁছে যাক মানুষের দোরগোড়ায়।
মনে রাখতে হবে, সন্তান আমাদের কথা শুনে যতটা শেখে, তার চেয়ে বেশি শেখে আমাদের কাজ দেখে। আমরা যদি সত্যবাদী মানুষ চাই, তবে আগে নিজেদের সত্যবাদী হতে হবে। আমরা যদি মানবিক সমাজ চাই, তবে আগে নিজেদের আচরণে মানবিকতার পরিচয় দিতে হবে।
আসুন, এমন একটি বাংলাদেশ গড়ার উদ্যোগ নিই, যেখানে শিক্ষা মানুষকে জ্ঞানী করবে, নৈতিকতা তাকে সৎ করবে, আর মানবিকতা তাকে প্রকৃত মানুষ হিসেবে গড়ে তুলবে।
“সন্তানকে শুধু শিক্ষিত নয়, মানুষ হিসেবে গড়তে
মানুষ গড়ার দায়িত্ব এড়াবেন না
"নৈতিকতা ফিরুক পরিবার থেকে রাষ্ট্রে
“প্রযুক্তি বাড়ুক, বিবেক হারিয়ে না যাক” —
লেখক: "তাসলিমা মালেক কেয়া"