গণমানুষের সাথে
পোর্টাল: www.gonabarta.com | প্রিন্টের সময়: ৩১ অক্টোবর, ২০২৬, ০৯:৫৪ পিএম
"সম্পর্ক বনাম ম্যানুপুলেশন"
কিছু মানুষ সম্পর্ক ভাঙে না, সম্পর্কের ভেতর থেকেই সম্পর্ক টাকে হত্যা করে।
পৃথিবীতে এমন কিছু মানুষ আছে, যারা সামনে থেকে শত্রুতা করে না, সরাসরি আঘাতও করে না। তারা খুব নীরবে, ধৈর্য ধরে, হিসাব করে মানুষের মনের মধ্যে সন্দেহের বীজ বুনে দেয়। একজনের কথা আরেকজনের কাছে, আরেকজনের কথা অন্য কারও কাছে এমনভাবে প্যাকেজ আকারে পৌঁছে দেয় যে, একসময় আপন মানুষগুলোই একে অপরের কাছে অপরিচিত হয়ে যায়।এই সমাজে সম্পর্কের ম্যানুপুলেশনের খেলায় অনেকেই ডুবে আছে।অনেক পরিবারও ভেঙে যাচ্ছে।
সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হলো, এই খেলায় খেলোয়াড়কে সবাই দেখতে পায় না; কিন্তু তার সাজানো খেলায় একদিন সবাই কোনো না কোনোভাবে জড়িয়ে পড়ে।
কেউ কেউ সম্পর্ক তৈরি করতে আসে, আবার কেউ আসে সম্পর্কের ভেতরে নিজের জায়গা তৈরি করতে গিয়ে অন্যদের জায়গা ভেঙে দিতে। অন্যের সুখ, সম্মান, প্রতিষ্ঠা কিংবা পরিবারের ভালো অবস্থান যাদের মনে আনন্দের পরিবর্তে অস্বস্তি তৈরি করে, তারা কখনো কখনো সেই অস্বস্তির প্রতিশোধ নেয় অন্যের শান্তি নষ্ট করে।
অথচ অন্যের সাফল্য কারও ব্যর্থতা নয়। অন্যের সন্তান প্রতিষ্ঠিত হলে নিজের সন্তানের মর্যাদা কমে যায় না। অন্যের সম্মান বাড়লে নিজের সম্মান ছোট হয় না। তবু যাদের মন তুলনার আগুনে পোড়ে, তারা নিজের জীবন সুন্দর করার চেয়ে অন্যের সুন্দর জীবনটাকে অসুন্দর করতে বেশি ব্যস্ত হয়ে পড়ে।
আর এই খেলার সবচেয়ে নিষ্ঠুর দিক হলো— যে মানুষটি একসময় পরিবারের, আত্মীয়স্বজনের, এমনকি প্রতিবেশীদেরও আনন্দের কেন্দ্র ছিল, একদিন তাকেই সবার কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়।
যে মানুষটি সবার বিপদে পাশে দাঁড়িয়েছে, সম্পর্ক বাঁচাতে নিজের কষ্ট চেপে রেখেছে, কাউকে ছোট না করে সত্য কথা বলার চেষ্টা করেছে, সেই মানুষটিই একসময় প্রশ্ন করতে বাধ্য হয়— আমার অপরাধটা কোথায়?
কেন আজ পরিচিত মুখগুলো দূরের মানুষ?
কেন ভিকটিমের কথা শোনার আগেই ভিকটিম সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়ে যায়।
সবচেয়ে কষ্টের বিষয়, যখন সত্য বোঝার মতো মানুষ থাকে না, যখন নিজের নির্দোষিতা ব্যাখ্যা করার সুযোগটুকুও থাকে না, তখন নীরবতাকেও অপরাধ মনে হয়। প্রতিবাদ করলে দোষ, চুপ থাকলেও দোষ। সম্পর্ক বাঁচাতে এগিয়ে গেলে দুর্বলতা, আর নিজেকে সরিয়ে নিলে অহংকার!
কিন্তু একটা কথা মনে রেখো— কাউকে একা করে দিতে পারা সাফল্য হতে পারে, কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে তুমি সত্যের কাছে জয়ী হয়েছ।
মানুষকে কিছুদিন ভুল বোঝানো যায়, কিছু সম্পর্ক ভেঙে দেওয়া যায়, কারও চারপাশের মানুষগুলোকে দূরে সরিয়েও দেওয়া যায়। কিন্তু অন্যের মনে বিষ ঢেলে নিজের ভেতরটা সুস্থ রাখা যায় না। অন্যের শান্তি কেড়ে নিয়ে নিজের শান্তি নিশ্চিত করা যায় না।
সবচেয়ে দুঃখের বিষয় যাকে নিয়ে এত খেলার আয়োজন, তার কথাই কারোর শোনা হয়নি। একজন মানুষকে
ভিকটিম বানিয়ে সব দরজা বন্ধ করে দেয়, তাহলে সেটা হল একজন মানুষের মুখ বন্ধ করে দিয়ে তার সম্পর্কে অন্যায় ভাবে সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া। এভাবে কোন সম্পর্ক টিকে থাকে না। আজ সেই মানুষ, যে নিজের অপরাধ খুঁজে বেড়ায়, অথচ অপরাধটা কী— তা জানার সুযোগও পায় না। কারও কাছে অভিযোগ নিয়ে যেতে চায় না, কাউকে ছোট করতে চায়না, কাউকে জোর করে পাশে দাঁড় করাতেও চায়না। শুধু বিবেকের কাছে জানতে ইচ্ছে করে, এত বছরের সম্পর্ক, এত আন্তরিকতা, এত ভালোবাসা— সবকিছুর মূল্য কি এতটাই সামান্য ছিল?
নাকি কিছু মানুষের কাছে সম্পর্ক কেবল একটা দাবার বোর্ড, আর আপন মানুষগুলো নিছক ঘুঁটি?
যার মধ্যে ন্যূনতম নীতিবোধ আছে সে কাউকে অভিশাপ দেয় না। প্রতিশোধের পরিকল্পনাও করে না। কারণ সে বিশ্বাস করে, অন্যায়ের জবাব দিতে গিয়ে নিজের বিবেককে হারিয়ে ফেলা কোনো বিজয় নয়।
তবে সবার শিক্ষা নেওয়া উচিত, সবাইকে আপন ভাবা যায়, কিন্তু সবার হাতে নিজের বিশ্বাস তুলে দেওয়া যায় না। সবাইকে ভালোবাসা যায়, কিন্তু নিজের আত্মসম্মান বিসর্জন দিয়ে নয়। আর সব সম্পর্ক বাঁচানোর দায়িত্ব একা একজনের নয়।
যে সম্পর্ক বাঁচাতে একজন সারাজীবন চেষ্টা করে, আর অন্যজন নীরবে সেই সম্পর্কের শিকড় কাটে—
কেউ হয়তো আজ নিজের খেলায় সফল। হয়তো চারপাশে তার পছন্দের নীরবতা, তার হিসাবমতো দূরত্ব, তার ইচ্ছেমতো ভাঙন।
কিন্তুু সাফল্যের অর্থ অন্যের আপনজন কেড়ে নেওয়া নয়। সাফল্য হলো, এত আঘাতের পরও নিজের ভেতরের মানবিকতাটুকু বাঁচিয়ে রাখা।
ভিকটিম জানে না, ভিকটিমের এই কষ্টের শেষ কোথায়? কোনো দিন কেউ সত্যটা জানতে চাইবে কিনা? নীরবতা অপরাধের স্বীকারোক্তি নয়, আর একাকিত্ব কারও নির্দোষিতার প্রমাণ নয়।
সময় হয়তো সব সম্পর্ক ফিরিয়ে দেয় না, কিন্তু সময়ের কাছে একটা প্রশ্ন থেকেই যায়— কে সম্পর্ক গড়েছিল, কে সম্পর্ক আগলে রেখেছিল, আর কে সম্পর্ক ভাঙার আড়ালে নিজের জয় উদ্যাপন করেছিল?
উত্তরটা আজ না মিলুক, কোনো একদিন অন্তত নিজের বিবেকের সামনে দাঁড়িয়ে প্রত্যেক মানুষকে সেই উত্তর দিতেই হয়।
সম্পর্ক তো ভিক্ষার জিনিস নয় হাত বাড়ালেই পাওয়া যায়।